সূরা আল-ফাতিহা ও জাদু ___ শায়খ আব্দুল গাফফার মাদানী*
ফালাক্ব, সূরা আন-নাস। জাদুর প্রসঙ্গে সূরা আল-ফালাক্ব ও আন-নাসের গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ উভয় সূরাতেই বিভিন্ন অশুভতা ও অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়েছে।
ফাতিহার নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করা যাবে কি
এখানেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কেউ যদি বলে, ‘জাদু কাটানোর জন্য ফাতিহা অবশ্যই ৭ বার পড়তে হবে’, অথবা ‘৪১ বার পড়তেই হবে’, অথবা ‘৩১৩ বার পড়লে জাদু নিশ্চিতভাবে চলে যাবে’, তাহলে এই নির্দিষ্ট সংখ্যা ও নির্দিষ্ট ফলাফলের জন্য দলীল প্রয়োজন। অথচ ছহীহ হাদীছে ফাতিহা রুকইয়া হিসাবে প্রমাণিত; কিন্তু জাদু নষ্ট করার জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যায় ফাতিহা পড়ার কোন ছহীহ নছ জানা যায় না। তাই সাধারণ রুকইয়া করা এক বিষয়, আর দলীল ছাড়া নির্দিষ্ট সংখ্যা ও পদ্ধতিকে শরী‘আত নির্ধারিত আমল মনে করা আরেক বিষয়।
শিফার প্রকৃত মালিক কে?
এটি পুরো আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আক্বীদাগত দিক। ফাতিহা পড়া হচ্ছে কিন্তু শিফা দিচ্ছেন কে? আল্লাহ। আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর ভাষা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন,
وَ اِذَا مَرِضۡتُ فَہُوَ یَشۡفِیۡنِ
‘আমি যখন অসুস্থ হই, তখন তিনিই আমাকে সুস্থ করেন’ (সূরা আশ-শু‘আরা: ৮০)। সুতরাং ফাতিহা শিফার একটি শরী‘আতসম্মত মাধ্যম। কিন্তু শিফাদাতা ফাতিহা নয় বরং শিফাদাতা একমাত্র আল্লাহ।
বিশেষ সতর্কতা
জাদুর চিকিৎসার নামে যেসব কাজ থেকে বেঁচে থাকা যরূরী, তাহল- জাদু আক্রান্ত ব্যক্তির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অনেকেই শরী‘আয়তের নামে নানা কুসংস্কার ও শিরকী পদ্ধতি প্রচলন করে। মুমিনকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। যেমন— গণক বা জাদুকরের কাছে যাওয়া; জিনের কাছে সাহায্য চাওয়া; অজানা মন্ত্র ব্যবহার করা; তাবীয-কবচের ওপর নির্ভর করা; শরী‘আতসম্মত প্রমাণ ছাড়া বিশেষ সংখ্যা বা বিশেষ পদ্ধতিকে আবশ্যক মনে করা; রোগীর গায়ে অশোভন বা শয়ী‘আবিরোধী আচরণ করা; জাদুর চিকিৎসার নামে মানুষকে ভয় দেখিয়ে অর্থ উপার্জন করা। রুকইয়া যতই ‘চিকিৎসা’ হোক, তা কখনো শরী‘আতের সীমার বাইরে যেতে পারে না।
পরিশেষে বলতে চাই, জাদুর অন্ধকার যতই গভীর হোক, মুমিনের জন্য তা কখনোই আল্লাহর কালামের ঊর্ধ্বে নয়। তবে কুরআনের কোন সূরা বা আয়াতকে এমন কোন অলৌকিক সূত্রে পরিণত করাও ইসলামের শিক্ষা নয়, যার সঙ্গে দলীলের সম্পর্ক নেই। ফাতিহার শক্তি তার অজানা কোন গোপন মন্ত্রে নয়; বরং তার প্রতিটি শব্দের অন্তর্নিহিত তাওহীদ, বান্দার রবের প্রতি পূর্ণ নির্ভরতা এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনার মধ্যেই নিহিত। এ কারণেই ফাতিহার রুকইয়া নিছক একটি পাঠ নয়; এটি এক ধরনের ঈমানী প্রত্যাবর্তন— অসহায় বান্দার সর্বশক্তিমান রবের দিকে ফিরে আসা। সে পড়ে, দু‘আ করে, রুকইয়া করে; কিন্তু তার অন্তর কোন পাঠের ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে সেই সত্তার ওপর, যার অনুমতি ছাড়া কোন ক্ষতিই কাউকে স্পর্শ করতে পারে না। সুতরাং এ আলোচনার শেষ কথা হল- ফাতিহাকে তার প্রমাণিত মর্যাদায় রাখুন, তার ওপর এমন কিছু আরোপ করবেন না, যা শরী‘আত বলেনি; আর শিফার প্রত্যাশা রাখুন একমাত্র আল্লাহর কাছে। কারণ কুরআনের আয়াত বান্দার হাতে একটি আমল, কিন্তু শিফার ফয়সালা একমাত্র আল্লাহর হাতে। এটাই ফাতিহার প্রতি যথার্থ সম্মান, রুকইয়ার ক্ষেত্রে যথার্থ ভারসাম্য এবং তাওহীদের দাবী।
* শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, রাজশাহী।
তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৭৩৬; ছহীহ মুসলিম, হা/২২০১।
[২]. মাদারিজুস সালিকীন, ১ম খণ্ড (বৈরূত: দারুল কিতাবিল ‘আরাবী, ৩য় সংস্করণ, ১৪১৬ হি./১৯৯৬ খ্রি.) পৃ. ৭৮-৭৯।
Comments
Post a Comment